করোনার দ্বিতীয় ঢেউ  রোধে জোর প্রস্তুতি

admin
অক্টোবর ১২, ২০২০ ৮:৩১ পূর্বাহ্ণ
Link Copied!

দেশে শীত মৌসুমে করোনাভাইরাসের প্রকোপ নতুন করে বাড়তে পারে। আলোচনা হচ্ছে সংক্রমণের সম্ভাব্য দ্বিতীয় ঢেউ বা সেকেন্ড ওয়েভ নিয়ে। এই মহামারিকালে উত্তুরে হাওয়া বাংলাদেশে পৌঁছানোর আগেই করোনাভাইরাস নিয়ে সতর্ক করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। সাত মাসে প্রাণঘাতী এই ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে সাড়ে ৫ হাজার জনে দাঁড়িয়েছে। করোনায় শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৭৩ জন আক্রান্ত হয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে ১ হাজার ২০৩ জন। বেশ কিছুদিন ধরে সংক্রমণের হার নিম্নমুখী হলেও এখনও তা স্বস্তিকর মাত্রায় আসেনি। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার ঠিক করা নির্দেশনা অনুযায়ী, কোনো দেশে শনাক্তের হার টানা তিন সপ্তাহ ৫ শতাংশের নিচে থাকলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে ধরা যায়। সে হিসাবে দেশের সংক্রমণ পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়েছে।
বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা সেপ্টেম্বরেই জানিয়েছিল, শীতের আগেই উত্তর গোলার্ধের বিভিন্ন অঞ্চলে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে সংক্রমণ। শীতকালে মহামারি আরও মারাত্মক রূপ নিতে পারে বলেও
সতর্ক করেছে  সংস্থাটি। বাংলাদেশেও যে শীত মৌসুমে পরিস্থিতি খারাপ হতে পারে, সেই শঙ্কার কথা জানিয়ে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। সরকার প্রধানের নির্দেশনার পর রোডম্যাপ ধরে পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।
স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে কঠোর হচ্ছে সরকার। এর অংশ হিসেবে মাস্ক ছাড়া বাইরে দেখা গেলে জরিমানা বা শাস্তির ব্যবস্থা করা হতে পারে। বিশ^ব্যাপী মহামারি ছড়ানো করোনাভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কার না হওয়া পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই। ঋতু পরিবর্তনের সময় পরিস্থিতি কতটা নাজুক হবে তা নির্ভর করছে মৌসুমি রোগ, মানুষের আচরণ এবং সরকারের ব্যবস্থাপনার ওপর। তবে ভ্যাকসিন বা কার্যকর কোনো ওষুধ যেহেতু এখনও তৈরি হয়নি, গ্রীষ্মের মতো শীতেও করোনাভাইরাস থেকে বাঁচার উপায় ওই একটাইÑ কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা। তাই করোনাভাইরাসের সতর্কতার ওপর জোর দিতে চাচ্ছে সরকার। পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশন, রেডিও, অনলাইন ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ভাইরাস নিয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে জোর দেওয়া হচ্ছে। জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রচার করা হবেÑ মানুষ পরীক্ষাকে অবহেলা না করে ও পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আগেই যাতে হাসপাতালে আসতে উদ্বুদ্ধ হয়। শীতকালে পিকনিক বা এ ধরনের আয়োজনে নিষেধাজ্ঞার চিন্তা, সতর্কতা আসবে বিয়ের আয়োজনেও।
সরকারের রোডম্যাপ অনুযায়ী, করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশের বাজারে নিয়ে আসা। ঠান্ডাজনিত রোগ বা ইনফ্লুয়েঞ্জার টিকা, ভ্যাকসিন ও ওষুধের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা। করোনা চিকিৎসায় যে ওষুধ দরকার হয় আগেই সেগুলোর পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা।
দেশে করোনাভাইরাসের পরীক্ষাগার বাড়লেও পরীক্ষা কমেছে। পরীক্ষার সংখ্যা আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সে লক্ষ্যে অ্যান্টিজেন টেস্টের নীতিগত সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যেই অনুমোদন করা হয়েছে। প্রতিটি জেলায় একাধিক পরীক্ষাগারে আরটি পিসিআর মেশিনে পরীক্ষা নিশ্চিত করা। যেসব হাসপাতালকে করোনা হাসপাতাল হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল সেগুলোকে প্রয়োজনে আবারও করোনা হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করা হবে। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা আরও জোরদার করা এবং এ সংক্রান্ত ওষুধের যেন কোনো সঙ্কট না থাকে সেটা নিশ্চিত করা হবে।
করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে আরেক দফা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়তে পারে। দেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ দেখা দেওয়ার পর ১৭ মার্চ থেকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। আটকে যাওয়া উচ্চ মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষা আর চিরাচরিত নিয়মে হচ্ছে না। তার বদলে জেএসসি ও এসএসসির ফলাফলের গড় করে মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষা সরাসরি গ্রহণ না করে ভিন্ন পদ্ধতিতে মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এদের জেএসসি ও এসএসসির ফলের গড় অনুযায়ী এইচএসসির ফল নির্ধারণ করা হবে। মহামারির এই নজিরবিহীন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই প্রথম পরীক্ষা না নিয়ে বিকল্প মূল্যায়নে যেতে হচ্ছে সরকারকে। এর আগে এ বছর প্রাথমিক ও ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা বাতিল করে স্ব-স্ব প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা বা মূল্যায়নের নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। অষ্টম শ্রেণির জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) ও জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষাও বাতিল করা হয়েছে। নভেম্বরে এসব পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সহসাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলছে না। চলতি বছর সব ক্লাসে অটো প্রমোশনে শিক্ষার্থীরা পরের শ্রেণিতে উঠবে। যেখানে এইচএসসির মতো বড় পাবলিক পরীক্ষা থেকে সরে এসেছে সেখানে শ্রেণিভিত্তিক উত্তীর্ণেও অটো প্রমোশন দেওয়া হবে।
করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলার অংশ হিসেবে বিপণিবিতান রাত ৮টার পর বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দোকান মালিক সমিতি। শনিবার রাজধানীর বিভিন্ন বিপণিবিতানে রাত ৮টার মধ্যে দোকান বন্ধ রাখার জন্য মাইকিং করতে দেখা গেছে। এ প্রসঙ্গে দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন সময়ের আলোকে বলেন, করোনার শুরু থেকেই বিপণিবিতান বন্ধ রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে জীবন ও জীবিকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে রাত ৮টা পর্যন্ত স্বাস্থ্যবিধি মেনে বিপণিবিতান খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ধর্মীয় নানা উৎসব উপলক্ষ করে বিপণিবিতানগুলো অনেক রাত পর্যন্ত খোলা রাখা হয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসতে পারে। সেদিকটি বিবেচনায় নিয়ে বিপণিবিতান আবারও রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখা হবে। এটি কার্যকর করার জন্য ইতোমধ্যে বিপণিবিতানগুলোর সমিতির কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। অনেকে বিষয়টি ভুলে যাওয়ার কারণে নতুন করে মাইকিং করে জনসাধারণকে অবহিত করা হচ্ছে। এ সপ্তাহ থেকেই এই সময় কার্যকর হচ্ছে।
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। মহামারির প্রথম ধাক্কায় যুক্তরাজ্যে ৪০ হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ গেছে। জুলাই থেকে সংক্রমণ ও মৃত্যু কমে আসছিল, কিন্তু সেপ্টেম্বর থেকে আবার তা বাড়তে শুরু করেছে। যুক্তরাজ্যের মতো শীতপ্রধান অনেক দেশেই ঋতু পরিবর্তনের পর দ্বিতীয় ধাপের সংক্রমণ শুরু হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছে। ইতালিতেও করোনার দ্বিতীয় ধাক্কা শুরু হয়েছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে ইতালিতে করোনা সংক্রমণ আবারও বাড়তে শুরু করেছে।
সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এসএম আলমগীর বলেন, শীতের দেশে শীতের দিনে ঝুঁকি যতটা বাড়বে, উষ্ণ মণ্ডলের দেশ বাংলাদেশে তেমন নাও হতে পারে। শীতে যদি করোনাভাইরাস অনেক বেশি ভয়ঙ্কর নাও হয়ে ওঠে, তারপরও বাংলাদেশের মানুষের জীবনযাপন পদ্ধতির কারণে শীত মৌসুমে ঝুঁকি বাড়ার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছেÑ শীতে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পায়। বিভিন্ন সংক্রমণ রোগ বাড়ে এই সময়।
আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, করোনাভাইরাস মোকাবিলা নিয়ে বেশ ভালো একটা অভিজ্ঞতা সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সবার হয়েছে। রোগী সামলানো, ভাইরাস পরীক্ষাসহ প্রস্তুতির একটি বড় অভিজ্ঞতা হয়েছে যার ভিত্তিতে কাঠামোও তৈরি হয়েছে। এমনকি ভাইরাসের আঘাতের পর একটা নির্দিষ্ট সময় পরেই বেশিরভাগ রোগী ভালো হয় অথবা পরেও কিছু চিকিৎসার দরকার হয়, এসব বিষয়ে অভিজ্ঞতা হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, ফিল্ড হাসপাতাল হয়েছে অনেকগুলো যেগুলো সব হয়তো সেভাবে কাজে লাগেনি কিন্তু সেগুলো আছে। পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক স্বাস্থ্যকর্মীর প্রশিক্ষণ হয়েছে এবং মানুষেরও আস্থা এসেছে। এগুলোর ভিত্তিতেই সেকেন্ড ওয়েভ মোকাবিলায় সরকার পদক্ষেপ নিতে পারে। তবে এরপরেও সংক্রমণ প্রতিরোধে কমিউনিটিভিত্তিক বিনিয়োগ বাড়ানোর দিকে এখনই দৃষ্টি দেওয়া দরকার বলে মনে করেন তিনি।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, সেকেন্ড ওয়েভ শুরু হলে তার কী কী করণীয় সেই প্রস্তুতি এখনই নেওয়া হচ্ছে। আমাদের স্বাস্থ্য খাত করোনাভাইরাস সংক্রমণ মোকাবিলায় এরই মধ্যে সক্ষমতা দেখিয়েছে। দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় সরকারের সব রকমের প্রস্তুতি থাকবে বলে জানান মন্ত্রী।
শনিবার প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে, এক দিনে আরও ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, এতে মৃতের সংখ্যা বেড়ে সাড়ে ৫ হাজার জনে দাঁড়িয়েছে। নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে ১২০৩ জন। তাদের নিয়ে দেশে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৭৩ জন। বাসা ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও ১ হাজার ৪৫৩ জন রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছেন গত এক দিনে। তাতে সুস্থ রোগীর মোট সংখ্যা বেড়ে ২ লাখ ৯১ হাজার ৩৬৫ জন হয়েছে।
দেশে ১০৯টি ল্যাবে ১০ হাজার ৮৫৯টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত পরীক্ষা হয়েছে ২০ লাখ ৬১ হাজার ৫২৮টি নমুনা। ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় শনাক্তের হার ১১ দশমিক ০৮ শতাংশ, এ পর্যন্ত মোট শনাক্তের হার ১৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। শনাক্ত বিবেচনায় সুস্থতার হার ৭৭ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং মৃত্যুর হার ১ দশমিক ৪৬ শতাংশ।